:

রেকর্ড গড়ল সরকার: ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছাড়াল ৬ লাখ কোটি টাকা

top-news

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ও আর্থিক খাতের সংস্কারে তহবিলের জোগান দিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।

প্রথমবারের মতো দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণের স্থিতি বা বকেয়া ৬ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম দিকে সরকার ঋণ পরিশোধের ধারায় থাকলেও, গত দুই মাসে (নভেম্বর-ডিসেম্বর ও জানুয়ারি আংশিক) ঋণ গ্রহণের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চিত্রটি বেশ নাটকীয়। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সরকার ব্যাংক থেকে নতুন করে ঋণ নেওয়ার বদলে আগের ঋণের ৫০৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। ফলে অক্টোবরে সরকারের মোট ঋণস্থিতি কমে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৫০২ কোটি টাকায় নেমেছিল।

তবে এরপরই পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ফলে ৪ জানুয়ারি শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৬৬১ কোটি টাকায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকার এখন বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক—উভয় উৎস থেকেই সমানতালে ঋণ নিচ্ছে।

গত জুন শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকারের ঋণ ছিল ৯৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। ৪ জানুয়ারি তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৬ কোটি টাকা।

একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৮৮ হাজার ২৩২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত জুনের তুলনায় ৩৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা বেশি।

ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত দুটি কারণ চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা:
১. ব্যাংক একীভূতকরণে সহায়তা: সম্প্রতি পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর মূলধন জোগান দিতে সরকার গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু বা সহায়তা প্রদান করেছে। এটি ঋণের স্থিতি বাড়ার অন্যতম বড় কারণ।

২. রাজস্ব ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য:সরকারের আশানুরূপ রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। গত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা ৯৯ হাজার কোটি টাকা থাকলেও সরকার নিয়েছিল ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই খাত থেকে নিট ২ হাজার ৩৬ এক কোটি টাকা ঋণ এসেছে। ফলে সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকায়।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অধিক মাত্রায় ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করতে পারে। এছাড়া সরাসরি টাকা ছাপিয়ে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তা মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক খাত সংস্কারে সরকারের এই পদক্ষেপ অনিবার্য হয়ে পড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
একনজরে মূল তথ্য :
মোট ব্যাংক ঋণস্থিতি:৬ লাখ ১০ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা (৪ জানুয়ারি পর্যন্ত)।
সাম্প্রতিক বৃদ্ধি:গত দুই মাসে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বৃদ্ধি:২৪ হাজার ৬ কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ বৃদ্ধি:৩৫ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।
মূল কারণ:সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন জোগান ও রাজস্ব ঘাটতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *